জালিয়ানওয়ালাবাগ: ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক বাঙালির লড়াই
![]() |
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট: ক্ষোভের আগুন এবং দমনমূলক আইন
স্বাগতম "অজানা ইতিহাসের খোঁজে" (In Search of Unknown History) ব্লগে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পটভূমি বুঝতে গেলে আমাদের একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর থেকে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের প্রতি অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে। বিশ শতকের শুরুতে এই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজরা ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই আশায় মহাত্মা গান্ধী সহ বহু ভারতীয় নেতা যুদ্ধে ব্রিটিশদের সমর্থন করেন এবং ভারতবাসী বিপুল সংখ্যায় যুদ্ধে যোগ দেয়।
[ ** আরও পড়ুন: কাশ্মীরের ইতিহাসের সেই রোমহর্ষক অধ্যায়টি কি পড়েছেন? জানুন শেষ হিন্দু সম্রাজ্ঞী কোটারানির অজানা কাহিনী — কাশ্মীরের 'ক্লিওপেট্রা' কোটারানি: কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রানী ]
কিন্তু ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংরেজ সরকারের নীতিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। উল্টো, যুদ্ধফেরত সৈন্যদের বেকার করে দেওয়া হয়, দেশে অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর সাথে যুক্ত হয় ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির প্রকোপ, যাতে এক কোটির বেশি মানুষ মারা যান। ভারতবাসীর ক্ষোভ যখন চরমে, তখন ইংরেজ সরকার তাদের দমন করার জন্য মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইনের পাশাপাশি 'রাওলাট আইন' নামে একটি নির্যাতনমূলক আইন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই আইনের অধীনে বিনা কারণে গ্রেপ্তার, অন্তরীন এবং সংক্ষিপ্ত বিচার ও বন্দীত্বের বেপরোয়া পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয় পুলিশকে।
অমৃতসরের অশান্ত পরিস্থিতি
এই আইনের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী অহিংস ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেন। পাঞ্জাবেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পাঞ্জাব যাওয়ার পথে গান্ধীজিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অমৃতসরের দুই জনপ্রিয় নেতা ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ সাইফুদ্দিন কিচলুকেও ইংরেজ সরকার গ্রেপ্তার করে অজানা স্থানে পাঠিয়ে দেয়। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অমৃতসর জুড়ে ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ শুরু হয়। ইংরেজ প্রশাসন অমৃতসরে সেনা মোতায়েন করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারকে দায়িত্ব দেয়।
১৩ এপ্রিল ১৯১৯: 'খুনি বৈশাখী'
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ছিল শিখ ধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব বৈশাখীর দিন। এই দিন জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে ডঃ সত্যপাল এবং ডঃ কিচলুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এক জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও সভা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, কিন্তু বহু মানুষ বিশেষ করে গ্রামের বাসিন্দারা যারা বৈশাখী মেলায় এসেছিলেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষ সেইদিন ওই উদ্যানে জমা হয়েছিলেন।
![]() |
| ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এবং কুখ্যাত গণহত্যা। ছবিটি AI দিয়ে বানানো। |
![]() |
| On April 13, 1919, one of the most brutal and infamous massacres in history took place at Jallianwala Bagh in Amritsar, Punjab. This image was created using AI. |
এই সভায় বাঙালি ডাক্তার ষষ্ঠী চরণ মুখার্জীও উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি মঞ্চ থেকে সভা পরিচালনা করছিলেন। সভা চলাকালীন ব্রিগেডিয়ার ডায়ার তার গুর্খা সৈন্যদের নিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগের একমাত্র সংকীর্ণ প্রবেশপথে এসে দাঁড়ান। কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা না দিয়েই তিনি সৈন্যদের গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
[** আরও পড়ুন: মানুষের দেহে কুকুরের মাথা! ইতিহাসের এক চাপা পড়া সত্য, পড়ুন -"সাইনোসেফালি: ইতিহাসের রহস্যময় কুকুরমুখো মানুষের অজানা ইতিবৃত্ত"]
জালিয়ানওয়ালাবাগ ছিল চারিদিকে উঁচু দেওয়ালে ঘেরা, বেরোনোর কোনো রাস্তা ছিল না। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ পালাবার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। সৈন্যরা অবিরাম গুলি চালাতে থাকে। সরকারি হিসাবে ৩৭৯ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও, ধারণা করা হয় আসল সংখ্যা ১,০০০-এর বেশি এবং ১,২০০-এর বেশি মানুষ আহত হন। ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানোর পর সৈন্যদের গুলি ফুরিয়ে গেলে গুলিবর্ষণ থামে। গুলির হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই উদ্যানের মাঝখানে অবস্থিত কুয়োতে ঝাঁপ দেন। কুয়োতে পড়া মানুষদের ওপর পাথর ফেলে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল বলে পরে জানা যায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে 'খুনি বৈশাখী' হিসেবে ইতিহাসে স্মরণ করা হয়।
![]() |
| সেই কুখ্যাত "The butcher of Amritsar" নামে খ্যাত কর্নেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ার । |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিবাদ এবং নাইটহুড ত্যাগ
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর প্রথম দিকে ইংরেজরা চেপে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি মনে করেছিলেন, এমন এক নৃশংসতার পর ইংরেজদের দেওয়া কোনো সম্মান গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। ১৯১৯ সালের ৩১ মে বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখে তিনি তাঁর "নাইটহুড" উপাধি ত্যাগ করেন। এই চিঠি গোটা ভারতে এক নতুন চেতনা জাগিয়ে তোলে। তিনি লিখেছিলেন: "...The time has come when badges of honour make our shame glaring in the incongruous context of humiliation..... compelled me to ask Your Excellency, with due reference and regret, to relieve me of my title of Knighthood..."। এই চিঠিটি ইতিহাসের এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা প্রতিবাদ।
![]() |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিবাদ এবং নাইটহুড ত্যাগ। ছবিটি AI দ্বারা নির্মিত। |
এক বাঙালির লড়াই: জালিয়ানওয়ালাবাগের সুরক্ষা
![]() |
| Original Photograph: Dr. Mukherjee, Trustee of the Jallianwala Bagh National Memorial Trust |
হত্যাকাণ্ডের পর ইংরেজরা প্রমাণ লোপ করার জন্য জালিয়ানওয়ালাবাগকে বাজার বা মার্কেট বানাতে চেয়েছিল। সাড়ে ছয় একরের এই জমিটির মালিক ছিলেন হিম্মত সিং। তিনি জমিটি বিক্রি করার জন্য নিলাম ডাকেন। এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন ডাক্তার ষষ্ঠী চরণ মুখার্জী। হুগলির দশঘরায় জন্ম নেওয়া এই বাঙালি ডাক্তার মদনমোহন মালব্যের আমন্ত্রণে এলাহাবাদ থেকে অমৃতসরে এসেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি মঞ্চ থেকে সভা পরিচালনা করছিলেন এবং মঞ্চের নিচে লুকিয়ে তিনি কোনোমতে বেঁচে যান।
[ ** আরও পড়ুন: ৫,০০০ বছর আগে পুরুষ জনসংখ্যার মধ্যে যে হঠাৎ পতন (Genetic Bottleneck) দেখা গিয়েছিল, তার সাথে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কি কোনো সম্পর্ক আছে?" পড়ুন - ৫,০০০ বছরের জেনেটিক রহস্য ও মহাভারত: বিজ্ঞানের আয়নায় কুরুক্ষেত্র ]
ডাক্তার মুখার্জী মনস্থির করলেন শহিদদের স্মৃতিতে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তুলবেন। তিনি জাতীয় কংগ্রেসকে জমিটি অধিগ্রহণ করার অনুরোধ জানান। ১৯২০ সালে কংগ্রেসের বৈঠকে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি পাস হয়। জমিটির দাম ঠিক হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু কংগ্রেসের কাছে অত টাকা ছিল না। মহাত্মা গান্ধী জমিটি কেনার জন্য ভারতবাসীকে অর্থ দান করার আহ্বান জানান। ডাক্তার মুখার্জী নিজে দরজায় দরজায় ঘুরে প্রায় ৯ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। ১৯২০ সালের ১ আগস্ট ডাক্তার মুখার্জী নিলামে জালিয়ানওয়ালাবাগের জমিটি কিনে নেন এবং ইংরেজদের প্রমাণ লোপের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। এই "অপরাধে" তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল।
![]() |
| ১৯২০ সালের ১ আগস্ট ডাক্তার মুখার্জী নিলামে জালিয়ানওয়ালাবাগের জমিটি কিনে নেন |
স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং বাঙালিদের উত্তরাধিকার
ডাক্তার মুখার্জীর লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালের ১ মে জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠিত হয়, যার প্রথম সম্পাদক হন ডাক্তার মুখার্জী। আমেরিকার বেঞ্জামিন পোলক স্মৃতিসৌধের নকশা তৈরি করেন। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল, বৈশাখীর দিন, তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন।
![]() |
| On April 13, 1961—the day of Baisakhi—the then President of India, Dr. Rajendra Prasad, inaugurated the Jallianwala Bagh Memorial. |
আজও এই ট্রাস্টের দায়িত্বে আছেন ষষ্ঠী চরণ মুখার্জীর পরিবার। ট্রাস্টের বর্তমান সম্পাদক ডাক্তারবাবুর নাতি সুকুমার মুখার্জী, যাঁকে এই দায়িত্বে নিয়ে এসেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। এর আগে তাঁর বাবা উত্তম চরণ মুখার্জী ট্রাস্টের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে পাঞ্জাবে খলিস্তানি উগ্রপন্থীদের দাপটের সময় উত্তম চরণ মুখার্জী খালি হাতে উগ্রপন্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগকে রক্ষা করেছিলেন।
পাপের প্রায়শ্চিত্ত: জালিয়ানওয়ালাবাগের খলনায়কদের শেষ পরিণাম
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই কারিগর—জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ার এবং পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ার—উভয়কেই তাঁদের কৃতকর্মের জন্য ইতিহাসের আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। নিষ্ঠুরতার প্রতীক জেনারেল ডায়ারকে হান্টার কমিশনের তদন্তের পর সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে লন্ডনে ফেরত পাঠানো হয়। যদিও ব্রিটিশ রক্ষণশীলদের একাংশ তাঁকে 'পাঞ্জাবের রক্ষাকর্তা' হিসেবে সংবর্ধনা দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর শেষ জীবন ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। ১৯২৭ সালে পরপর কয়েকটি স্ট্রোক এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একাকী ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। কথিত আছে, মৃত্যুর আগে তিনি নিজের কাজের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয়ে ভুগতেন। অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী মাইকেল ও'ডায়ারকে তাঁর পাপের ফল ভোগ করতে হয়েছিল দীর্ঘ ২১ বছর পর। ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ, লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে এক জনসভায় ভারতীয় বিপ্লবী উধম সিং তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই রক্তাক্ত বৈশাখীর বদলা নিয়ে উধম সিং প্রমাণ করেছিলেন যে, নিরপরাধ মানুষের রক্ত বৃথা যায় না। ডায়ার শারীরিক অসুস্থতায় ধুঁকে মরলেও, ও'ডায়ারকে বরণ করতে হয়েছিল এক চরম নাটকীয় এবং সহিংস মৃত্যু।
![]() |
| উধম সিং, udham Singh |
উধম সিংকে নিয়ে ভিকি কৌশলের একটি সিনেমা আছে। সিনেমাটির নাম 'সর্দার উধম' (Sardar Udham)। এটি ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি সুপরিচিত হিন্দি ভাষার বায়োগ্রাফিক্যাল পিরিয়ড ড্রামা। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সুজিত সরকার। এতে ভিকি কৌশল প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে মাইকেল ও'ডায়ারকে হত্যার ঘটনা এবং উধম সিংয়ের জীবনের সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সিনেমাটি অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে (Amazon Prime Video) উপলব্ধ।
উপসংহার: ব্রিটেনের দুঃখপ্রকাশ এবং বাঙালি বীরের প্রতি শ্রদ্ধা
জালিয়ানওয়ালাবাগের ১০৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ব্রিটেন এই নৃশংসতার জন্য কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি, তারা শুধুই "দুঃখিত"। যদিও ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি এবং ব্রিটেনের কিছু নাগরিক পরে হত্যাকাণ্ডের স্থানে গিয়ে হাঁটু গেড়ে মাথা নোয়ান এবং অনুশোচনা প্রকাশ করেন, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বিরত থেকেছে।
ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দুঃখপ্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু সরাসরি ‘ক্ষমা’ (Apology) চাওয়া হয়নি। এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ডেভিড ক্যামেরনের সফর (২০১৩): তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অমৃতসর পরিদর্শনে গিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং পরিদর্শন বইতে এই ঘটনাকে ব্রিটিশ ইতিহাসের একটি “গভীর লজ্জাজনক ঘটনা” (Deeply shameful event) বলে বর্ণনা করেন। তবে তিনিও ‘ক্ষমা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি।
২. শতবর্ষ স্মারক (২০১৯): হত্যাকাণ্ডের ১০০ বছর পূর্তির সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই ঘটনার জন্য “গভীর দুঃখ” (Deep regret) প্রকাশ করেন। তিনি এই ঘটনাকে “ব্রিটিশ-ভারতীয় ইতিহাসের এক লজ্জাজনক ক্ষত” বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমার দাবির প্রেক্ষিতে তিনি নীরব থাকেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই ঘটনার জন্য “গভীর দুঃখ” (Deep regret) প্রকাশ করেন।৩. রানি এলিজাবেথের মন্তব্য (১৯৯৭): তাঁর ভারত সফরের সময় রানি এলিজাবেথ জালিয়ানওয়ালাবাগে গিয়ে বলেছিলেন যে, এটি ইতিহাসের একটি “দুঃখজনক উদাহরণ” (Distressing example), তবে ইতিহাসকে পুনরায় লেখা যায় না।
[ ** আরও পড়ুন: জেমস বন্ড বা টাইগার নয়, চিনে নিন ভারতের সেই ৫ জন আসল 'রিয়েল লাইফ' গোয়েন্দাকে, যাদের রোমহর্ষক কাহিনী সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়, পড়ুন - অদৃশ্য প্রহরীর উপাখ্যান: রূপালি পর্দার 'ধুরন্ধর' বনাম ভারতের রক্তমাংসের ৫ রিয়েল-স্পাইয়ের রোমহর্ষক কাহিনী ]
ব্রিটিশ সরকারের এই অবস্থানের পেছনে কিছু রাজনৈতিক ও আইনি কারণ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলে তা ঔপনিবেশিক আমলের অন্যান্য অপরাধের জন্যও ক্ষমার দাবির পথ প্রশস্ত করতে পারে এবং আইনি জটিলতা বা ক্ষতিপূরণের দাবির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ আজ আমাদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। শহিদদের রক্তের দাগ আর বুলেটের চিহ্নের সাক্ষী এই উদ্যান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের কাছে অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে, যে ব্যক্তি জালিয়ানওয়ালাবাগকে রক্ষা করার জন্য এত লড়াই করলেন, তাঁর কোনো ছবি আমাদের কাছে নেই। স্মৃতিসৌধ তৈরির পর উদ্বোধনের সময় তাঁর একটি গ্রুপ ছবি পাওয়া গেলেও, সেখানে তাঁর নাম কোথাও উল্লেখ নেই।
এই নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিককে আমরা যেন চিরতরে ভুলে না যাই। তাঁর লড়াই এবং ত্যাগ জালিয়ানওয়ালাবাগের পবিত্র মাটির সাথে মিশে আছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের এই কালো ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে এক বাঙালির নিঃস্বার্থ সংগ্রাম, যা আজ আমাদের গর্বের এবং অনুরাগের বিষয়।
#জালিয়ানওয়ালাবাগ #ইতিহাস #ষষ্ঠীচরণ_মুখার্জী #রবীন্দ্রনাথ_ঠাকুর #স্বাধীনতা_সংগ্রাম #JallianwalaBagh #IndianHistory #BengaliHero #অজানা_ইতিহাসের_খোঁজে #ইতিহাসের_খোঁজে #ভারতের_ইতিহাস #রহস্যময় #IndianHistory #HistoricalMystery #অজানা_ভারত
লেখাটির তথ্যসূত্র:
বাংলা তথ্যসূত্র:
* পাল, প্রশান্তকুমার. রবিজীবনী (সপ্তম খণ্ড). আনন্দ পাবলিশার্স. (রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ এবং সি এফ অ্যান্ডরুজের ভূমিকার জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য)।
* ঘোষ, অভ্র. "স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আয়োজন নিজেদের লজ্জাকেই স্থায়ী করার বন্দোবস্ত". আনন্দবাজার পত্রিকা (১৩ এপ্রিল ২০১৯). (জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ নির্মাণের বিতর্ক এবং ষষ্ঠীচরণ মুখার্জীর প্রচেষ্টার উল্লেখ রয়েছে)।
* "জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড". *উইকিপিডিয়া* (বাংলা সংস্করণ).
ইংরেজি তথ্যসূত্র (English References):
* Wagner, Kim A. (2019). Jallianwala Bagh: An Empire of Fear and the Making of the Amritsar Massacre. Penguin Books. (এই হত্যাকাণ্ড এবং ডায়ারের ভূমিকার ওপর একটি সাম্প্রতিক ও বিস্তারিত গবেষণা)।
* Wolpert, Stanley (2009). Shameful Flight: The Last Years of the British Empire in India. Oxford University Press. (ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ নীতির ওপর আলোকপাত)।
* Collett, Nigel (2005). The Butcher of Amritsar: General Reginald Dyer. Hambledon & London. (জেনারেল ডায়ারের জীবনী এবং হত্যাকাণ্ডের বিবরণ)।
* Datta, V. N. (1969). Jallianwala Bagh. Lyall Book Depot. (হত্যাকাণ্ডের ওপর একটি ধ্রুপদী কাজ)।
* "Jallianwala Bagh keeper passes away". Hindustan Times (April 10, 2018). (উত্তম চরণ মুখার্জীর মৃত্যু এবং তাঁর পরিবারের অবদানের উল্লেখ)।
প্রাথমিক উৎস (Primary Sources):
* Disorders Inquiry Committee Report (Hunter Committee Report, 1920). (হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট)।
* Tagore, Rabindranath. "Letter to the Viceroy renouncing Knighthood" (May 31, 1919). (রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক চিঠি)।

















অসাধারণ লাগলো পড়ে, অনেক কিছুই জানতে পারলাম
উত্তরমুছুন