অদৃশ্য প্রহরীর উপাখ্যান: রূপালি পর্দার 'ধুরন্ধর' বনাম ভারতের রক্তমাংসের ৫ রিয়েল-স্পাইয়ের রোমহর্ষক কাহিনী
রবীন্দ্র কৌশিক: ভারতের শ্রেষ্ঠ আন্ডারকভার এজেন্ট ‘দ্য ব্ল্যাক টাইগার’
স্বাগতম "অজানা ইতিহাসের খোঁজে" (In Search of Unknown History) ব্লগে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর ইতিহাসে রবীন্দ্র কৌশিক এমন এক নাম, যা শুনলে আজও শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তিনি ছিলেন এমন এক অকুতোভয় যোদ্ধা, যিনি নিজের দেশের জন্য নিজের নাম, ধর্ম, পরিচয় এবং অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে শত্রুদেশের হৃদপিণ্ডে হানা দিয়েছিলেন।
![]() |
| Real photo of Ravindra Kaushik (The Black Tiger). |
শৈশব ও অভিনয়ের মঞ্চ থেকে গোয়েন্দা দুনিয়া
১৯৫২ সালে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে রবীন্দ্র কৌশিকের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল থিয়েটার ও অভিনয়ের প্রতি। লখনউতে একটি জাতীয় স্তরের ড্রামা ফেস্টিভ্যালে তাঁর অসামান্য অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন RAW-এর কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা সংস্থাটি তখন এমন একজনকে খুঁজছিল, যে পাকিস্তানি সংস্কৃতি ও ভাষায় অনর্গল মিশে যেতে পারবে। রবীন্দ্রর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং বিভিন্ন চরিত্রে অবলীলায় ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে গোয়েন্দা হওয়ার যোগ্য করে তোলে।
![]() |
| রবীন্দ্র কৌশিক (দ্য ব্ল্যাক টাইগার) আসল ছবি |
কঠিন প্রশিক্ষণ ও পরিচয় পরিবর্তন
১৯৭৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে রবীন্দ্র কৌশিককে RAW-তে নিয়োগ করা হয়। শুরু হয় তাঁর জীবনের কঠিনতম রূপান্তর। তাঁকে দুই বছর দিল্লিতে কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়:
তাঁকে ইসলাম ধর্ম এবং পবিত্র কোরআন সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা দেওয়া হয়।
[ ** আরও পড়ুন: ৫,০০০ বছর আগে পুরুষ জনসংখ্যার মধ্যে যে হঠাৎ পতন (Genetic Bottleneck) দেখা গিয়েছিল, তার সাথে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কি কোনো সম্পর্ক আছে?" পড়ুন - ৫,০০০ বছরের জেনেটিক রহস্য ও মহাভারত: বিজ্ঞানের আয়নায় কুরুক্ষেত্র ]
পাঞ্জাবি অধ্যুষিত পাকিস্তানের ভাষা ও চালচলন নিখুঁতভাবে রপ্ত করানো হয়।
এমনকি তাঁর শারীরিক কিছু পরিবর্তনও করা হয় যাতে তাঁকে পাকিস্তানি মুসলিম হিসেবে কোনোভাবেই শনাক্ত করা না যায়।
অবশেষে তাঁর নতুন নাম দেওয়া হয় 'নবী আহমেদ শাকির'। তাঁর অতীত ভারতের বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানে।
পাকিস্তানের সেনা অফিসার ‘নবী আহমেদ শাকির’
পাকিস্তানে পৌঁছে রবীন্দ্র কৌশিক করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তাঁর মেধা ও পরিশ্রমের জোরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর পদমর্যাদায় উন্নীত হন।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
একজন ভারতীয় হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্দরমহলে বসে থাকা—এটি ছিল এক অভাবনীয় সাফল্য। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাকে পাকিস্তানের সামরিক কৌশল, অস্ত্রাগার এবং পারমাণবিক পরিকল্পনার এমন সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেন, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর দেওয়া তথ্যের নির্ভুলতা দেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বৈবাহিক জীবন ও নীরব সংগ্রাম
নিজের ছদ্মবেশকে নিখুঁত করতে রবীন্দ্র পাকিস্তানের এক স্থানীয় মেয়ে আমানতকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি পুত্রসন্তানও হয়। ভাবতে অবাক লাগে, দীর্ঘ কয়েক বছর একসাথে সংসার করার পরেও তাঁর স্ত্রী টের পাননি যে তাঁর স্বামী প্রকৃতপক্ষে একজন ভারতীয় গুপ্তচর।
পতনের ট্র্যাজেডি ও বীরের বিদায়
১৯৮৩ সালে RAW-এর একটি বড় ভুল রবীন্দ্রর জীবন তঞ্চছ করে দেয়। ইনায়াত মসিহ নামে এক নতুন এজেন্টকে রবীন্দ্রর সাথে যোগাযোগ করার জন্য পাঠানো হলে সে ধরা পড়ে যায় এবং জেরার মুখে রবীন্দ্রর পরিচয় ফাঁস করে দেয়।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
শিয়ালকোটের টর্চার সেলে টানা দুই বছর তাঁর ওপর নারকীয় নির্যাতন চালানো হলেও তিনি একটি তথ্যও ফাঁস করেননি। দীর্ঘ ১৬ বছর পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকার পর ২০০১ সালে এই মহাবীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে জেলের পেছনেই কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে কবর দেয়।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
অজিত ডোভাল: ছদ্মবেশ ও বুদ্ধির লড়াইয়ে ভারতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘জেমস বন্ড’
ভারতের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের জীবন কোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। তাঁকে 'ভারতের জেমস বন্ড' বলা হয় কারণ তিনি কেবল ফাইল হাতে ডেস্কে বসে কাজ করা অফিসার ছিলেন না, বরং সরাসরি ময়দানে নেমে শত্রুর ডেরায় ঢুকে অপারেশন চালানোয় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
অজিত ডোভাল ১৯৪৫ সালে উত্তরাখণ্ডের এক গড়োয়ালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালের কেরালা ক্যাডারের এই আইপিএস অফিসার তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থা 'আইবি' (Intelligence Bureau)-তে। তাঁর সাহসিকতা ও রণকৌশল তাঁকে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
১. পাকিস্তানের বুকে ৭ বছর: এক মুসলিম ছদ্মবেশীর জীবন
অজিত ডোভালের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো পাকিস্তানে তাঁর অতিবাহিত সময়। তিনি টানা ৭ বছর পাকিস্তানে ভারতের আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে ছিলেন। সেখানে তিনি একজন পাকিস্তানি মুসলমানের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
বলা হয়, তিনি উর্দু ভাষায় এতটাই পারদর্শী ছিলেন এবং সেখানকার রীতিনীতি এত নিখুঁতভাবে রপ্ত করেছিলেন যে, তাঁর প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ ভাবতেই পারেনি তিনি একজন ভারতীয় হিন্দু এবং আইপিএস অফিসার। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পাকিস্তানের ভেতরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিল্লিতে পাঠিয়েছিলেন, যা ভারতের নিরাপত্তা রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
২. অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার: রিকশাওয়ালা সেজে স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশ
১৯৮৮ সালে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে যখন খলিস্তানি জঙ্গিরা কবজা করে নিয়েছিল, তখন অজিত ডোভাল এক অবিশ্বাস্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি মন্দিরের আশেপাশে একজন সাধারণ 'রিকশাওয়ালা' সেজে ঘুরতেন।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
তিনি জঙ্গিদের বিশ্বাস অর্জন করেন এবং নিজেকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর একজন এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দেন। জঙ্গিরা তাঁকে বিশ্বাস করে মন্দিরের ভেতরে নিয়ে যায় এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও অবস্থানের সব তথ্য দেখায়। ডোভাল সেই সব তথ্য বাইরে পাঠাতে থাকেন। তাঁর দেওয়া নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অপারেশন পরিচালনা করে জঙ্গিদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়।
** আরও পড়ুন: মানুষের দেহে কুকুরের মাথা! ইতিহাসের এক চাপা পড়া সত্য, পড়ুন -"সাইনোসেফালি: ইতিহাসের রহস্যময় কুকুরমুখো মানুষের অজানা ইতিবৃত্ত"]
৩. মিজোরাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের শান্তি রক্ষা
মিজোরামে যখন বিদ্রোহ চরম পর্যায়ে, তখন ডোভাল বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা লালডেঙ্গার আস্তানায় চলে গিয়েছিলেন। তিনি কেবল নেতার মন জয় করেননি, বরং বিদ্রোহ করা সাতজন কমান্ডারের মধ্যে ছয়জনকেই ভারতের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। এর ফলে মিজোরামে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সহজ হয়েছিল।
৪. কান্দাহার বিমান অপহরণ ও আলোচনা
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের আইসি-৮১৪ (IC-814) বিমানটি যখন জঙ্গিরা অপহরণ করে আফগানিস্তানের কান্দাহারে নিয়ে যায়, তখন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান মধ্যস্থতাকারী বা নেগোশিয়েটর হিসেবে পাঠানো হয়েছিল অজিত ডোভালকে। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জঙ্গিদের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলে যাত্রীদের সুরক্ষিত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
৫. বর্তমান ভূমিকা: ডোভাল ডকট্রিন
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অজিত ডোভালকে 'জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা' (NSA) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর অধীনেই ভারত সরকার প্রতিরক্ষা নীতিতে 'প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক' (Defensive Offence) নীতি গ্রহণ করে।
* মায়ানমার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক: উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গিদের দমনে মায়ানমার সীমান্তে ঢুকে অপারেশন চালানো।
* উরি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক: পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করার পেছনে ডোভালের মস্তিস্ক ও পরিকল্পনা প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
* অপারেশন সিঁদুর' (Operation Sindoor): ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী ঘাঁটির ওপর ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা সামরিক অভিযান—'অপারেশন সিঁদুর' (Operation Sindoor)-এর অন্যতম প্রধান কারিগর হলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) অজিত ডোভাল । তিনি এই অভিযানের পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় এবং দেশীয় প্রযুক্তির (যেমন ব্রহ্মোস) সফল ব্যবহারে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।ডোভাল এই অপারেশনের মাধ্যমে ভারতের "প্রতিরোধমূলক হামলা" (pre-emptive strike) নীতির দৃঢ় বাস্তবায়ন করেছেন ।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
অজিত ডোভাল ভারতের প্রথম পুলিশ অফিসার যিনি সামরিক সম্মান ‘কীর্তি চক্র’ (Kirti Chakra)-তে ভূষিত হন, যা সাধারণত রণক্ষেত্রে বীরত্বের জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া হয়।
অপারেশন সাতোরি: শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে RAW-এর এক গোপন অধ্যায়
RAW (Research and Analysis Wing)-এর ইতিহাসে 'অপারেশন সাতোরি' এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা 'রহস্যময় দাসী' বা নারী এজেন্টদের কাহিনী গোয়েন্দা জগতের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এই অপারেশনটি ছিল অত্যন্ত গোপন এবং কৌশলগত।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
আশির দশকের শেষভাগে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শ্রীলঙ্কায় লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম (LTTE) এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে গৃহযুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে, তখন ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে তামিল আবেগ, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশের অখণ্ডতা রক্ষা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে RAW-কে চালাতে হয়েছিল এক ছায়া যুদ্ধ।
অপারেশনের প্রেক্ষাপট
'সাতোরি' (Satori) শব্দটি মূলত জাপানি জেন বৌদ্ধধর্ম থেকে এসেছে, যার অর্থ 'হঠাৎ আলোকপ্রাপ্তি' বা 'জাগরণ'। এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল LTTE-এর ভেতরের খবর বের করা এবং তাদের অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। ভারতীয় শান্তি রক্ষা বাহিনী (IPKF) যখন শ্রীলঙ্কায় মোতায়েন ছিল, তখন RAW-এর এই গোপন সেলটি নেপথ্যে থেকে কাজ করছিল।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
উপগ্রহ চিত্র ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
অপারেশন সাতোরির একটি বড় অংশ ছিল প্রযুক্তিগত গোয়েন্দাবৃত্তি। সেই সময়ে ভারত রাশিয়ার সাহায্যে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে শ্রীলঙ্কার জাফনা পেনিনসুলা এবং জঙ্গলে ঘেরা এলাকাগুলোর উচ্চমানের উপগ্রহ চিত্র (Satellite Imagery) সংগ্রহ করে।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
* এই ছবিগুলোর মাধ্যমে LTTE-এর লুকানো বাঙ্কার, প্রশিক্ষন শিবির এবং সমুদ্রপথে আসা অস্ত্রের জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা হতো।
* এই তথ্যগুলো শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে সরবরাহ করা হতো যাতে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততা বোঝা না যায়।
[ ** আরও পড়ুন: কাশ্মীরের ইতিহাসের সেই রোমহর্ষক অধ্যায়টি কি পড়েছেন? জানুন শেষ হিন্দু সম্রাজ্ঞী কোটারানির অজানা কাহিনী — কাশ্মীরের 'ক্লিওপেট্রা' কোটারানি: কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রানী ]
রহস্যময় দাসী: ছদ্মবেশী নারী এজেন্টদের ভূমিকা
এই অপারেশনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় অংশ ছিল নারী এজেন্টদের ব্যবহার। গোয়েন্দা পরিভাষায় এদের অনেক সময় 'স্লিপার সেল' বা 'হানিপট' হিসেবেও দেখা হয়, তবে অপারেশন সাতোরিতে তাঁদের ভূমিকা ছিল আরও গভীর।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
১. সাধারণ দাসীর ছদ্মবেশ: RAW-এর প্রশিক্ষিত নারী এজেন্টরা শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী নেতা এবং LTTE-এর উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের বাড়িতে 'দাসী', 'রাধুনি' বা 'সেবিকা' হিসেবে কাজে ঢুকে পড়তেন। তাদের সাদামাটা পোশাক আর শান্ত স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি।
২. তথ্য সংগ্রহ: ঘর পরিষ্কার করা বা খাবার পরিবেশন করার অছিলায় তারা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দেখে নিতেন। অনেক সময় কমান্ডারদের মদ্যপ অবস্থায় মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কথা বা বেডরুমে হওয়া গোপন আলাপগুলো তারা বিশেষ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাইরে পাঠিয়ে দিতেন।
৩. কৌশলগত অন্তর্ঘাত (Sabotage): কথিত আছে, অপারেশন সাতোরির অধীনে বেশ কিছু 'টার্গেটেড কিলিং' বা শত্রু খতমের কাজে এই নারী এজেন্টরা বিষ প্রয়োগ বা খাবারে নেশাদ্রব্য মিশিয়ে দেওয়ার মতো কাজও করেছিলেন। তবে সরকারিভাবে কোনো দেশই এই ধরণের অভিযানের কথা স্বীকার করে না।
৪. লজিস্টিক সাপোর্ট: এই রহস্যময় নারী এজেন্টরা জাফনার স্থানীয় বাজারে সাধারণ বিক্রেতা সেজে থাকতেন। তারা লক্ষ্য রাখতেন কারা জঙ্গলে খাবার বা ওষুধ সরবরাহ করছে। তাদের দেওয়া সংকেতের ভিত্তিতেই অনেক সময় ভারতীয় কমান্ডোরা ঝটিকা অভিযান চালাত।
অপারেশনের সমাপ্তি ও গোপনীয়তা
অপারেশন সাতোরি ভারতের গোয়েন্দা ইতিহাসের এমন এক অংশ যা কোনোদিনও জনসমক্ষে আনা হয়নি। রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর শ্রীলঙ্কায় ভারতের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তবে আজও গোয়েন্দা মহলে গুঞ্জন শোনা যায় যে, LTTE প্রধান প্রভাকরণের অনেক ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ভারতের এই 'রহস্যময় দাসীরা' বিচরণ করতেন, যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজ করে গেছেন।
কাশ্মীর সিং: ৩৫ বছরের নরকবাস এবং এক অটুট মৌনতা
কাশ্মীর সিং-এর কাহিনী কেবল গোয়েন্দাগিরির গল্প নয়, এটি হলো এক অদম্য মানসিক শক্তি এবং নিঃশব্দ দেশপ্রেমের মহাকাব্য। ৩৫ বছর পাকিস্তানের জেলখানায় কাটানোর পরও নিজের দেশের প্রতি তাঁর আনুগত্য তিলমাত্র টলেনি।
ভারতীয় গোয়েন্দা ইতিহাসের পাতায় কাশ্মীর সিং এমন এক নাম, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে লোহার শিকল বা অমানবিক নির্যাতন কোনোটিই একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের মনোবল ভাঙতে পারে না। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের জলসীমায় ধরা পড়ার পর থেকে ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও যন্ত্রণার আখ্যান।
![]() |
| Real photo of Kashmir Singh |
সাধারণ থেকে অসাধারণ: একজন গুপ্তচরের জন্ম
কাশ্মীর সিং আদতে কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের এক সাধারণ কৃষক এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন প্রাক্তন জওয়ান। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যখন ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন RAW বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন লোক খুঁজছিল যারা সীমান্ত পেরিয়ে ওপাড়ে গিয়ে খবরাখবর আনতে পারবে। কাশ্মীর সিং তাঁর সাহসিকতার কারণে এই বিপজ্জনক কাজে রাজি হন।
মিশন ও গ্রেফতারি
১৯৭৩ সালে তাঁকে পাকিস্তানে গোয়েন্দা নজরদারির জন্য পাঠানো হয়। তাঁর কাজ ছিল পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটি এবং সীমান্ত এলাকায় গতিবিধির ওপর নজর রাখা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে সন্দেহ করে এবং পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিণ্ডি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পাকিস্তানের আদালত তাঁকে 'গুপ্তচরবৃত্তি' এবং 'নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের' অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু আইনি জটিলতায় সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হয়ে তা আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিণত হয়।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
৩৫ বছরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ
কাশ্মীর সিং-এর জীবনের পরবর্তী ৩৫ বছর কেটেছে পাকিস্তানের সাতটি ভিন্ন ভিন্ন জেলে। তাঁর এই দীর্ঘ কারাবাসের সময়টি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:
* নির্জন কারাবাস: বছরের পর বছর তাঁকে একটি ছোট অন্ধকার ঘরে একা রাখা হয়েছিল, যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাত না।
* মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে ভারতের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য এবং তাঁর নিয়োগকর্তাদের নাম বের করার জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু কাশ্মীর সিং একবারের জন্যও স্বীকার করেননি যে তিনি একজন ভারতীয় এজেন্ট। তিনি সবসময় নিজেকে একজন সাধারণ পথভ্রান্ত ভারতীয় বলে দাবি করে গেছেন।
* পরিবারের সাথে বিচ্ছিন্নতা: এই দীর্ঘ ৩৫ বছরে তাঁর পরিবার জানত না তিনি বেঁচে আছেন কি না। তাঁর স্ত্রী পরমজিৎ কৌর একাই সন্তানদের মানুষ করেছেন এবং স্বামীর ফেরার আশায় দিন গুনেছেন।
অলৌকিক মুক্তি (২০০৮)
২০০৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন মানবাধিকার মন্ত্রী আনসার বার্নি লাহোরের কোট লখপত জেলে পরিদর্শন করতে গিয়ে এক বৃদ্ধ বন্দিকে দেখেন, যিনি বহু বছর ধরে সেখানে পড়ে আছেন। তাঁর করুণ অবস্থা দেখে মন্ত্রী ব্যথিত হন এবং তাঁর মুক্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন। অবশেষে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ মানবিক কারণে তাঁকে ক্ষমা করে ভারতে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
[ ** আরও পড়ুন: জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: ইংরেজরা ইতিহাস মুছে দিতে চাইলেও যে বাঙালি বীর এই পবিত্র ভূমি রক্ষা করেছিলেন। পড়ুন - জালিয়ানওয়ালাবাগ: ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক বাঙালির লড়াই ]
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও সত্যের স্বীকারোক্তি
২০০৮ সালের ৪ মার্চ যখন কাশ্মীর সিং ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পা রাখেন, তখন পুরো দেশ তাঁকে বীরের সম্মান জানায়। সীমান্তে পৌঁছানোর পর আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন—
"আমি দেশের জন্য গিয়েছিলাম এবং দেশের কাজই করেছি। দীর্ঘ ৩৫ বছর আমি একটি গোপন তথ্যও শত্রুর কাছে ফাঁস করিনি।"
![]() |
| This image captures the emotional moment in March 2008 when Indian prisoner Kashmir Singh returned to India after spending 35 years in Pakistani prisons. Photo credit alamy |
ফিরে আসার পর তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেন যে তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন ভারতীয় গোয়েন্দা ছিলেন। তাঁর এই স্বীকারোক্তি সেই সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, কারণ ভারত সরকার সাধারণত ধরা পড়া এজেন্টদের নিজেদের লোক বলে স্বীকার করে না।
সেহমত খান: এক কাশ্মীরি তরুণীর অসামান্য ত্যাগ ও গোয়েন্দা মিশন
সেহমত খান—এই নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আলিয়া ভাটের 'রাজি' সিনেমার সেই নিষ্পাপ অথচ ইস্পাত-কঠিন চরিত্রটি। কিন্তু সিনেমার রূপালি পর্দার আড়ালে বাস্তব জীবনের সেহমত খান ছিলেন আরও অনেক বেশি সাহসী এবং রহস্যময়। তাঁর জীবন ত্যাগের এক চরম উদাহরণ, যা ভারতের গোয়েন্দা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
![]() |
| সেহমত খান—এই নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আলিয়া ভাটের 'রাজি' সিনেমার সেই নিষ্পাপ অথচ ইস্পাত-কঠিন চরিত্রটি। |
সেহমত খান কোনো পেশাদার সৈনিক বা গোয়েন্দা সংস্থার ঝানু অফিসার ছিলেন না। তিনি ছিলেন কাশ্মীরের এক সাধারণ কলেজপড়ুয়া তরুণী। কিন্তু তাঁর রক্তে ছিল দেশপ্রেম, কারণ তাঁর বাবা ছিলেন হিদায়ত খান—যিনি নিজে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য কাজ করতেন।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
কেন সেহমতকে বেছে নেওয়া হয়েছিল?
১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ঠিক আগের সময়। সীমান্ত উত্তপ্ত। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা (IB/RAW) খবর পায় যে পাকিস্তান বড় কোনো হামলার ছক কষছে। হিদায়ত খান জানতেন তাঁর শরীরে মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, তাই তিনি তাঁর একমাত্র মেয়ে সেহমতকে দেশের প্রয়োজনে শত্রুর ডেরায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেহমতও বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখতে রাজি হন।
বিয়ের আড়ালে মিশন: পাকিস্তান গমন
সেহমতের মিশনটি ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং কঠিন। পাকিস্তানের এক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার ছেলে ইকবাল সাঈদের সঙ্গে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বিয়ের পর সেহমত পাকিস্তানে পাড়ি জমান। লক্ষ্য ছিল একটাই—পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্দরমহলে ঢুকে ভারতের জন্য চোখ ও কান হিসেবে কাজ করা।
![]() |
| ছবি AI দিয়ে বানানো |
আইএনএস বিক্রান্ত (INS Vikrant) ও সেহমতের বুদ্ধিমত্তা
সেহমতের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ভারতের গর্ব 'আইএনএস বিক্রান্ত' যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। পাকিস্তানে থাকাকালীন তিনি অত্যন্ত গোপনে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর কিছু গোপন নথিপত্র এবং সংকেত উদ্ধার করেন। সেখান থেকেই ভারত জানতে পারে যে পাকিস্তান তাদের সাবমেরিন 'পিএনএস গাজী' (PNS Ghazi) পাঠিয়ে আইএনএস বিক্রান্তকে ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
সেহমতের পাঠানো এই নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভারত আগেভাগেই সতর্ক হয় এবং পাল্টা হামলায় পিএনএস গাজীকে বঙ্গোপসাগরের তলায় সমাধিস্থ করে। এই একটি তথ্য ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
![]() |
| ছবিটি AI দিয়ে তৈরি যন্ত্রণাদায়ক আত্মত্যাগ |
গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে সেহমতকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। নিজের ছদ্মবেশ বজায় রাখতে এবং তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির কয়েকজনকে হত্যা পর্যন্ত করতে হয়েছিল। এমনকি তাঁর স্বামী ইকবালের প্রতিও তাঁর মনে এক ধরণের ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু দেশের কর্তব্যের সামনে তিনি আবেগকে স্থান দেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর আসল পরিচয় ফাঁস হওয়ার উপক্রম হলে তাঁকে অতি কষ্টে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।
পরবর্তী জীবন ও অন্তরালে প্রস্থান
ভারত-পাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেহমত যখন ভারতে ফিরে আসেন, তখন তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি পাকিস্তানের সেই সেনাপতির নাতিকে জন্ম দেন এবং তাকে বড় করে তোলেন। তবে যুদ্ধের বিভীষিকা এবং তাঁর করা হত্যাগুলো তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তিনি বাকি জীবনটা পাঞ্জাবের একটি ছোট গ্রামে আড়ালে কাটান।
![]() |
| ছবিটি AI দিয়ে নির্মিত |
হারিন্দর সিক্কার লেখা বই 'কলিং সেহমত' (Calling Sehmat)-এর মাধ্যমেই বিশ্ব প্রথম এই মহীয়সী নারীর কথা জানতে পারে। লেখক হারিন্দর যখন সেহমতের সঙ্গে দেখা করেন, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন যে এই নারী দেশের জন্য এত কিছু করেও কোনো প্রচার বা পুরস্কারের আশা করেননি।
উপসংহার:
এই প্রতিটি গোয়েন্দার জীবনের এক একটি অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যখন শান্তিতে ঘুমাই, তখন সীমান্তে বা শত্রুর ডেরায় কোনো এক 'অজ্ঞাতপরিচয়' ভারতীয় নিজের জীবন বাজি রেখে পাহারা দিচ্ছেন। তাদের কোনো মেডেল নেই, প্রকাশ্যে সম্মান নেই, এমনকি মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ নিজের দেশে ফেরত পাওয়ারও কোনো গ্যারান্টি নেই। সিনেমার শেষে ক্রেডিট রোল ওঠে, আমরা হাততালি দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু এই আসল হিরোদের জীবনের শেষে কোনো হাততালি ছিল না। ছিল শুধু একাকীত্ব, ত্যাগ আর এক বুক অভিমান। 'ধুরন্ধর' সিনেমার রোমাঞ্চ একদিন ফিকে হয়ে যাবে, কিন্তু রবীন্দ্র কৌশিক বা সেহমত খানদের এই আত্মত্যাগ যেন আমাদের ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে। তবুও তারা ভারতের অতন্দ্র প্রহরী।
সব ছবি ভিডিও Google এবং Ai মাধ্যমে তৈরি
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১. রবীন্দ্র কৌশিক (দ্য ব্ল্যাক টাইগার)
বই: The Black Tiger: The Inspiring True Story of India's Finest Spy – লেখক: আর. কে. যাদব (প্রাক্তন RAW কর্মকর্তা)।
নিবন্ধ: "The story of Ravindra Kaushik: India's best spy in Pakistan" – The Times of India (IndiaTimes)।
ডকুমেন্টারি: 'The Black Tiger' (Discovery Plus বা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইউটিউব চ্যানেল)।
২. অজিত ডোভাল (ভারতের জেমস বন্ড)
বই: Doval: The Unconventional Spy – লেখক: বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
বিকাশ ও নীতি: "The Doval Doctrine" সংক্রান্ত বিভিন্ন সেমিনার ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক নিউজ পোর্টাল (যেমন: The Print, IDR - Indian Defence Review)।
অপারেশন: অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার ও মিজোরাম শান্তি চুক্তি নিয়ে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভ রিপোর্ট।
৩. সেহমত খান (অপারেশন সেহমত)
বই: Calling Sehmat – লেখক: হারিন্দর সিক্কা (এই বইটির ওপর ভিত্তি করেই 'রাজি' সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে)।
সাক্ষাৎকার: হারিন্দর সিক্কার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার যেখানে তিনি সেহমত খানের বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়েছেন।
৪. কাশ্মীর সিং
সংবাদ প্রতিবেদন: "After 35 years in Pak jail, Kashmir Singh returns home" – Reuters ও BBC News (মার্চ ২০০৮)।
মানবাধিকার রিপোর্ট: পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী আনসার বার্নির অফিসিয়াল রেকর্ড এবং তৎকালীন সংবাদপত্রের কাটিং।
৫. অপারেশন সাতোরি ও শ্রীলঙ্কা মিশন
বই: Mission: Sri Lanka (An Inside Account of RAW’s Role) – লেখক: পি. আর. চারি।
বই: The Kaoboys of R&AW: Down Memory Lane – লেখক: বি. রমন (RAW-এর প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব)।
আরো বিস্তারিত জানতে:- The Print (Ravindra Kaushik): ব্ল্যাক টাইগার রবীন্দ্র কৌশিকের জীবন এবং তাঁর পরিবারের কষ্টের ওপর একটি বিস্তারিত ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট।
Firstpost (Sehmat Khan): 'রাজি' সিনেমার পেছনের আসল চরিত্র সেহমত খান এবং তাঁর অসাধ্য সাধনের গল্প।



























মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আমাদের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় আপনার সুচিন্তিত মতামত ও আলোচনা একান্ত কাম্য। অনুগ্রহ করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন।