কাশ্মীরের 'ক্লিওপেট্রা' কোটারানি: কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রানী
কাশ্মীর—যাকে আমরা পৃথিবীর ‘ভূস্বর্গ’ বলে জানি। বরফে ঢাকা পাহাড়, ঝিলামের শান্ত জল আর টিউলিপের সমারোহে ঘেরা এই উপত্যকার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস। এই ইতিহাসের পাতায় এমন এক মহীয়সী নারীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, যার কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। তিনি কোটারানি—কাশ্মীরের শেষ হিন্দু সম্রাজ্ঞী। তাকে বলা হয় ‘ভূস্বর্গের ক্লিওপেট্রা’। কেন এই তুলনা? কারণ মিশরের রানী ক্লিওপেট্রার মতোই তিনি ছিলেন অসামান্য সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং নিজের সাম্রাজ্য রক্ষায় কূটনীতি ও সৌন্দর্যের অমোঘ ব্যবহার জানতেন। তবে কোটারানির বিশেষত্ব ছিল তাঁর দেশপ্রেম এবং আত্মসম্মানবোধ, যা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য শিখরে বসিয়েছে।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে কোটারানি: প্রেক্ষাপট ও উত্থান
স্বাগতম "অজানা ইতিহাসের খোঁজে" (In Search of Unknown History) ব্লগে। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুটা কাশ্মীরের জন্য ছিল অত্যন্ত অস্থির। ১৩০১ সালে রাজা সহদেব সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজসভায় দুই বিদেশি মিত্রের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো—লাদাখের বৌদ্ধ রাজপুত্র রিঞ্চিন এবং সোয়াত উপত্যকা থেকে আসা মুসলিম ভাগ্যান্বেষী শাহমির। এই সময়েই রাজসভার মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ান তেজস্বী সেনাপতি রামচন্দ্র। এই সেনাপতির কন্যাই ছিলেন কোটারানি। পিতার কাছ থেকেই তিনি শাসনকাজ এবং সামরিক কৌশলের প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছিলেন।
১৩১৯ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরের আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। তাতার উপজাতির নিষ্ঠুর সেনাপতি দুলচু ৭০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে কাশ্মীর আক্রমণ করেন। রাজা সহদেব ভীরুর মতো রাজধানী ছেড়ে ভাই উদয়ন দেবের সাথে কিস্ত্বরে পালিয়ে যান। কিন্তু রামচন্দ্র, রিঞ্চিন ও শাহমির হার মানেননি। দুলচু কাশ্মীরজুড়ে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। দীর্ঘ আট মাস তাণ্ডব চালিয়ে প্রচুর ধনসম্পদ এবং হাজার হাজার কাশ্মীরিকে দাস হিসেবে নিয়ে যখন দুলচু ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন বিখ্যাত জজিলা পাস (Zojila Pass) অতিক্রম করার সময় এক ভয়াবহ তুষারঝড়ে তিনি ও তাঁর সমস্ত সৈন্য মারা যান। দুলচু চলে গেলেও কাশ্মীর তখন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রিঞ্চিনের সাথে পরিণয়
অরাজকতার সুযোগ নিয়ে রিঞ্চিন ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করেন। তিনি ছদ্মবেশে দুর্গ আক্রমণ করে রামচন্দ্রকে হত্যা করেন এবং তাঁর পরিবারকে বন্দি করেন। কিন্তু প্রজাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য রিঞ্চিন এক অদ্ভুত চাল চালেন। তিনি রামচন্দ্রের পুত্র রাবণচন্দ্রকে প্রশাসকের পদ দেন এবং সুন্দরী ও বিদুষী কোটারানিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
[** আরও পড়ুন: মানুষের দেহে কুকুরের মাথা! ইতিহাসের এক চাপা পড়া সত্য, পড়ুন -"সাইনোসেফালি: ইতিহাসের রহস্যময় কুকুরমুখো মানুষের অজানা ইতিবৃত্ত"]
অনেকে মনে করেন, কোটারানি বাধ্য হয়ে এই বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, কোটারানি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন, বিশৃঙ্খল কাশ্মীরকে শান্ত করতে হলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন। তিনি চেয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে কাশ্মীরি সংস্কৃতি ও হিন্দু শাসন ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখতে। বিয়ের পর তিনি রিঞ্চিনকে হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেন। রিঞ্চিন হিন্দু হতে চাইলেও তৎকালীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণরা তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে রিঞ্চিন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নাম নেন মালিক সদরুদ্দিন। এভাবে কাশ্মীর পায় তার প্রথম মুসলিম শাসক। কোটারানি তখন তাঁর হিন্দু সত্তা বজায় রেখেই শাসনকার্যে স্বামীকে বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন।।
উদয়ন দেবের রাজত্ব ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলা
১৩২৬ সালে রিঞ্চিনের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে ফের সংকট তৈরি হয়। রিঞ্চিনের পুত্র হায়দার তখন নাবালক। এই সময়ে কোটারানি প্রবীণদের পরামর্শে এবং রাজ্যের স্থিতিশীলতার খাতিরে সহদেবের ভাই উদয়ন দেবকে বিয়ে করেন। কিন্তু উদয়ন দেবও ছিলেন দুর্বল চিত্তের।
পুনরায় যখন এক তাতার সর্দার কাশ্মীর আক্রমণ করেন, উদয়ন দেব তাঁর ভাই সহদেবের মতো স্ত্রী ও রাজত্বকে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলে তিব্বতের দিকে পালিয়ে যান। এই সংকটময় মুহূর্তে কোটারানি পালিয়ে যাননি; তিনি নিজেই যুদ্ধের হাল ধরেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা সেনাবাহিনীর মধ্যে বিজয়ের আবেগ তৈরি করে। তাঁর ডাকে সাধারণ নাগরিকরাও দেশপ্রেমের টানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শাহমির এবং তাঁর ভাই ভিক্ষন ভট্টের সহযোগিতায় তিনি তাতার সেনাবাহিনীকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। স্বামী উদয়ন দেব ফিরে আসার পর রানী তাঁকে পুনরায় সিংহাসনে বসান, কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত চাবিকাঠি ছিল কোটারানির হাতেই। এভাবে তিনি কাশ্মীরের উপর হিন্দু শাসন বজায় রাখতে সফল হন।
একজন সফল প্রশাসক: ‘কুট কোল’ ও নগর পরিকল্পনা
কোটারানি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই দক্ষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আধুনিকমনা প্রশাসক। শ্রীনগর শহরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি ঝিলাম নদী থেকে একটি খাল খনন করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘কুট কোল’ (কোটা খাল)। এই খালটি শহরের প্রবেশপথে ঝিলাম থেকে জল পায় এবং আবার শহরের সীমা ছাড়িয়ে ঝিলামের সাথে মিশে যায়। এই স্থাপত্যশৈলী আজও তাঁর দূরদর্শিতা ও জনহিতকর কাজের স্বাক্ষর বহন করছে। প্রশাসনিক জটিলতা সমাধান এবং বিচার ব্যবস্থাতেও তাঁর ছিল প্রখর মগজাস্ত্র।
শেষ রক্ষা ও চূড়ান্ত আত্মত্যাগ: শাহমিরের উত্থান
১৩৩৮ সালে উদয়ন দেবের মৃত্যুর পর কোটারানি আনুষ্ঠানিকভাবে শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু এবার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী শাহমির। শাহমিরের মনে দীর্ঘকাল ধরে কাশ্মীরের সুলতান হওয়ার বাসনা ছিল। তিনি প্রথমে ভিক্ষন ভট্টকে নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করেন। এরপর তিনি রানীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং রানীকে ওদিলপুর দুর্গে কোণঠাসা করে ফেলেন।
[ ** আরও পড়ুন: জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: ইংরেজরা ইতিহাস মুছে দিতে চাইলেও যে বাঙালি বীর এই পবিত্র ভূমি রক্ষা করেছিলেন। পড়ুন - জালিয়ানওয়ালাবাগ: ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক বাঙালির লড়াই ]
শাহমির জানতেন, কোটারানিকে বিবাহ করতে পারলে তাঁর সিংহাসনের দাবি বৈধতা পাবে এবং স্থানীয় সমর্থনও বাড়বে। তাই তিনি রানীকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে জোর করে রাজি করান। রানী যখন দেখলেন যে সামরিকভাবে তিনি পরাজিত এবং শাহমিরের হাতে বন্দি হওয়া নিশ্চিত, তখন তিনি এক চরম সিদ্ধান্ত নিলেন।
বাসর রাতে শাহমির যখন বিজয়ের উল্লাসে রানীর ঘরে প্রবেশ করেন, তখন কোটারানি বধুবেশে পূর্ণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। শাহমির কাছে আসতেই রানী তাঁর কোমরবন্ধন থেকে লুকানো ছুরি বের করে নিজের তলপেটে আঘাত করে আত্মাহুতি দেন। রক্তাক্ত রানী ঢলে পড়ার আগে শাহমিরের উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ কথাটি ছিল— “এটিই আমার উত্তর!” নিজের সম্মান, ধর্ম ও সংস্কৃতির মর্যাদা বাঁচাতে তিনি আত্মবলিদান দিলেন, কিন্তু কোনো প্রতারকের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। এভাবেই কাশ্মীরে হিন্দু শাসনের অবসান ঘটে এবং ইসলামের শাসন কার্যকর হয়।
এক ঐতিহাসিক বিতর্ক এবং কোটারানির দূরদর্শিতা
কোটারানির জীবনের এই বীরত্ব ও ট্র্যাজেডি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু বিতর্কও বিদ্যমান। বিশেষ করে, ফার্সি ঐতিহাসিকরা এবং কাশ্মীরি পণ্ডিত ঐতিহাসিকরা রিঞ্চিনের ইসলাম গ্রহণ এবং কোটারানির আত্মত্যাগের কারণ ও ধরণগুলোকে কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য: কোটারানি ছিলেন একাধারে বুদ্ধিমতী, রূপসী, দক্ষ রাজনীতিবিদ এবং অসাধারণ প্রশাসক। তাঁর জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত—রিঞ্চিনকে বিয়ে করা, পরবর্তীতে উদয়ন দেবকে বিয়ে করে হিন্দু শাসন টিকিয়ে রাখা, এবং শেষে শাহমিরের কাছে আত্মসমর্পণ না করে আত্মাহুতির পথ বেছে নেওয়া—সবই এক চূড়ান্ত দেশপ্রেম এবং আত্মসম্মানবোধের পরিচয় দেয়।
কাশ্মীরের ইতিহাস থেকে কোটারানির নাম দীর্ঘকাল বিস্মৃত ছিল। সম্ভবত, তাঁর জীবনের করুণ পরিণতির কারণে ইতিহাসের পাতায় তিনি কিছুটা উপেক্ষিত ছিলেন। তবে বর্তমানে তাঁর এই বীরত্বগাথা আবারও সামনে আসছে। রকেশ কৌলের ঐতিহাসিক উপন্যাস 'The Last Queen of Kashmir' কোটারানির জীবন ও কিংবদন্তির উপর ভিত্তি করে রচিত। এমনকি রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ এবং মধু মান্তেনার সাথে মিলে কোটারানির জীবনী নিয়ে বড় পর্দায় চলচ্চিত্র নির্মাণেরও ঘোষণা করেছে।
[ ** আরও পড়ুন: জেমস বন্ড বা টাইগার নয়, চিনে নিন ভারতের সেই ৫ জন আসল 'রিয়েল লাইফ' গোয়েন্দাকে, যাদের রোমহর্ষক কাহিনী সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়, পড়ুন - অদৃশ্য প্রহরীর উপাখ্যান: রূপালি পর্দার 'ধুরন্ধর' বনাম ভারতের রক্তমাংসের ৫ রিয়েল-স্পাইয়ের রোমহর্ষক কাহিনী ]
কোটারানি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, একজন প্রকৃত শাসককে শুধুমাত্র যুদ্ধ করতে জানলেই চলে না, তাঁকে তাঁর প্রজাদের জন্য, তাঁর সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়। কাশ্মীর উপত্যকার প্রতিটি নদীর কলতান, প্রতিটি তুষারাবৃত পাহাড় আজও যেন সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মহীয়সী নারীর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।
** আরও পড়ুন: ৫,০০০ বছর আগে পুরুষ জনসংখ্যার মধ্যে যে হঠাৎ পতন (Genetic Bottleneck) দেখা গিয়েছিল, তার সাথে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কি কোনো সম্পর্ক আছে?" পড়ুন - ৫,০০০ বছরের জেনেটিক রহস্য ও মহাভারত: বিজ্ঞানের আয়নায় কুরুক্ষেত্র ]
প্রত্যেক টি ছবি AI এর মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে
পার্থ ভৌমিক (আর্থিক উপদেষ্টা)
তথ্যসূত্র (Sources)
১. কৌল, রকেশ. দ্য লাস্ট কুইন অফ কাশ্মির (The Last Queen of Kashmir). হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া, ২০১৭। (এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, তবে এর ভিত্তি ঐতিহাসিক তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত)।
২. সুফি, গুলাম মহিউদ্দিন. কাশ্মির: এ হিস্ট্রি অফ কাশ্মির (Kashmir: A History of Kashmir). ভলিউম ১। লাইট অ্যান্ড লাইফ পাবলিশার্স, ১৯৮৪।
৩. বামজাই, প্রীতম নাথ কৌল. এ হিস্ট্রি অফ কাশ্মির (A History of Kashmir). মেট্রোপলিটন বুক কোম্পানি, ১৯৬২।
৪. কানিঙ্গা, স্যার আলেকজান্ডার. দ্য এনশিয়েন্ট জিওগ্রাফি অফ ইন্ডিয়া (The Ancient Geography of India). ট্রুবনার অ্যান্ড কোং, ১৮৭১। (কাশ্মীরের প্রাচীন ভূগোল ও রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট জানার জন্য)।
৫. উইকিপিডিয়া contributors. "Kota Rani." উইকিপিডিয়া, দ্য ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া।
৮. স্কুপ নিউজ (Scoop News). "Kota Rani: The Last Hindu Queen of Kashmir."










অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম, ধন্যবাদ আপনাকে লেখাটির জন্য
উত্তরমুছুন